Monday, December 29, 2014

পাণিগ্রহণ (নবনীতা দেবসেন)

কাছে থাকো। ভয় করছে। মনে হচ্ছে
এ মুহূর্ত বুঝি সত্য নয়। ছুঁয়ে থাকো।
শ্মশানে যেমন থাকে দেহ ছুঁয়ে একান্ত
স্বজন। এই হাত, এই নাও হাত।

এই হাত ছুঁয়ে থাকো, যতক্ষণ
কাছাকাছি আছো, অস্পৃষ্ট রেখো না।
ভয় করে, মনে হয়, এ মুহূর্ত বুঝি সত্য নয়।

যেমন অসত্য ছিল দীর্ঘ গতকাল,
যেমন অসত্য হবে অনন্ত আগামী।

গানের মতো (দেবরাজ চক্রবর্তী)

দু-তিন দিন আগে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনার কথা যতবার মনে পড়ছে, ততবার মনের মধ্যে বেশ কৌতুক অনুভব করছি... তাই ভাবলাম ঘটনাটা খুলেই বলি... আজ থেকে বছর প্রায় ১৬ বছর আগে আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়তাম, আমাদের সাথে বেশ সুন্দর দেখতে একটা মেয়ে পড়তো... মেয়েটির আমার বন্ধুত্ব ছিল না, কথাও বলতাম না খুব বেশি, কারণ আমি ছিলাম বেশ মুখচোরা... এই কারণেই হয়তো টিউশনের অন্যসব ছেলেদের থেকে বেশ পিছিয়ে ছিলাম... ফলে যা হয় আর কি... মেয়েটিও আমাকে মোটেই পছন্দ করতো না... কিন্তু আশ্চর্যভাবে ওর প্রেমে পড়েছিলাম আমি... সে সময় প্রেম মানে শুধু প্রেমই ছিল... স্কুলে যেতাম, সারাদিন ক্লাস, বাড়ি ফিরতাম,পড়তে যেতাম... খুব সামান্য জীবন, খুব সামান্য দিন... বৃষ্টি যেমন ভাবে আসে, যেমনভাবে রোদ আমাদের বাড়ির গেট ছাড়িয়ে উঠোনে এসে পরে, যেমনভাবে আমাদের পাড়ায় সন্ধে নামত, ঠিক তেমনই প্রেম... অনেকটা গানের মতো... আসলে কিছু কিছু মেয়ে অনেকটা গানের মতো হয়... এই যেমন এখন গান শুনতে শুনতে ভাবছি ওর কথা... যাই হোক, সে আমাকে পছন্দ করতো না... আমি জানতাম, আবার নিজের কাছে নিজের এই জানাটাই অস্বীকার করতাম... তারপর একদিন এল যখন সকলের সামনে খুব অকারণেই অপমানিত হতে হল... খারাপ লেগেছিল, কষ্টও হয়েছিল খুব... কারণ, অপমানটা ওই করেছিল... মুখ বুজেছিলাম, কিছু বলিনি... বাড়ি ফিরে ওর গান শুনছিলাম, কারণ ও ছিল গানের মতো... সারাজীবনেও ভুলতে পারিনি সেই অপমানের কথা... দু-তিনদিন আগে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দেখলাম ওকে... দেখে মনে হল একটুও বদলায়নি... ও হয়তো আমাকে দেখতে পায় নি, না পাওয়াটাই স্বাভাবিক... কিন্তু আমি ওকে দেখেছিলাম... এত গেল ওর কথা... কিন্তু, ওর বাবাকে আমি চিনতাম, কিন্তু ওর বাবা ভদ্রলোক আমাকে চিনতেন না... এবার ভদ্রলোকের সাথে আলাপ হল... আলাপ করিয়ে দিলেন একজন দাদা... আমার লেখার কথা জানালেন আমার প্রাক্তন সহপাঠিনীর বাবাকে... আশ্চর্য হলাম, যে ভদ্রলোক দু-একটা মেলায়, বিশেষ করে লিটল ম্যাগাজিনে আমার বইটি দেখেছেন, আমার কিছু লেখাও পড়েছেন... বিশেষ করে একটি প্রসিদ্ধ পুজো সংখ্যায় আমার লেখা আর সাধারণ সংখ্যায় আমার একগুচ্ছ প্রকাশিত কবিতাও লক্ষ্য করেছেন... সেই যাই হোক, বেশ কিছুক্ষণ কথা বলার পর ভদ্রলোক এগিয়ে গেলেন মঞ্চের দিকে... মঞ্চে উঠে ভদ্রলোক নানা বিষয়ে বক্তব্য রাখলেন...প্রাচীন বাংলা সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথ, বর্তমান বাংলা কবিতা ইত্যাদি ইত্যাদি... ওনার মেয়েও মঞ্চের সামনে বসে বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল... হাত্তালিও হচ্ছিল বেশ... আমি মঞ্চের থেকে বেশদূরেই ছিলাম... ভদ্রলোকের বক্তৃতা শুনতে শুনতে ভাবছিলাম, সত্যিই তো! কোথা থেকে আসে কবিতা? চারদিকে এত আড়ম্বর, এত সাজগোজ, এত কথা, এত শব্দ এর মধ্যেই কি বেঁচে থাকে কবিতা? না কবিতা বেঁচে থাকে তার থেকে অনেক দূরে, সভা থেকে অনেক দূরে, কিছু পুরনো জখমকে সঙ্গে নিয়ে, একা একা বেঁচে থাকে কবিতা, কিছু পুরনো গানকে সঙ্গে নিয়ে...সত্যিই, আমরা কতো কম জানি... যদি ওই ভদ্রলোক জানতে পারতেন...



(Debraj Chakraborty - https://www.facebook.com/debraj.chakraborty.94 posted this on his Facebook wall on December 29, 2014.)

নাছোড়বান্দা (অনিন্দ্য হাজরা)

হয়তো এখনও তোদের ঐ খেলাঘরে
আমার না-থাকা চকিতে নজরে পড়ে,
হয়তো এখনও বিকেলের আলো এসে
ডেকে নিয়ে যায় বেড়ানোর উদ্দেশে,
ছাদের ওপরে আসর সন্ধেবেলা
গল্প-কবিতা-গান-ধাঁধাঁ, কত খেলা।
সব কিছুতেই কিছুটা কি নেই ফাঁক,
দূর থেকে যদি না শুনিস কারো ডাক?
ঐ ফাঁকাটুকু দেখিস নি মন দিয়ে
ওটা ভরে ছিল সে তো আমাকেই নিয়ে
যার না থাকায় মনে হয়- সে যে নেই
ভাবনায় ভরে থাকে সে তো সেখানেই।
আর যদি কেউ নাও পড়ে তোর মনে,
ক্ষতি নেই কিছু, আছে সে বিস্মরণে,
স্মৃতি যদি তোর, বিস্মৃতি তবে তোরই,
যেখানে ভুলিস, সেইখানে বাস করি।
একেবারে মোরে এড়াবি কি তোর সাধ্য
মনে রেখে দিতে মনে মনে তুই বাধ্য।

সহসা এলে কি এ ভাঙ্গা জীবনে !

“পথ আজ হঠাৎ এ কী পাগলামি করলে। দুজনকে দু জায়গা থেকে ছিঁড়ে এনে আজ থেকে হয়তো এক রাস্তায় চালান করে দিলে। অ্যাস্ট্রনমার ভুল বলেছে। অজানা আকাশ থেকে চাঁদ এসে পড়েছিল পৃথিবীর কক্ষপথে– লাগল তাদের মোটরে মোটরে ধাক্কা, সেই মরণের তাড়নার পর থেকে যুগে যুগে দুজনে একসঙ্গেই চলেছে; এর আলো ওর মুখে পড়ে, ওর আলো এর মুখে। চলার বাঁধন আর ছেঁড়ে না। মনের ভিতরটা বলছে, আমাদের শুরু হল যুগলচলন, আমরা চলার সূত্রে গাঁথব ক্ষণে ক্ষণে কুড়িয়ে পাওয়া উজ্জ্বল নিমেষগুলির মালা। বাঁধা মাইনের বাঁধা খোরাকিতে ভাগ্যের দ্বারে পড়ে থাকবার জো রইল না; আমাদের দেনাপাওনা সবই হবে হঠাৎ।” 


 - (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শেষের কবিতা)

শাশ্বতী (সুধীন্দ্রনাথ দত্ত)

শ্রান্ত বরষা অবেলার অবসরে
প্রাঙ্গণে মেলে দিয়েছে শ্যামল কায়া ;
স্বর্ণ সুযোগে লুকাচুরি-খেলা করে
গগনে-গগনে পলাতক আলোছায়া।
আগত শরৎ অগোচর প্রতিবেশে ;
হানে মৃদঙ্গ বাতাসে প্রতিধ্বনি :
মূক প্রতীক্ষা সমাপ্ত অবশেষে
মাঠে, ঘাটে, বাটে আরব্ধ আগমনী।
কুহেলিকলুষ দীর্ঘ দিনের সীমা
এখনই হারাবে কৌমুদীজাগরে যে ;
বিরহবিজন ধৈর্যের ধূসরিমা
রঞ্জিত হবে দলিত শেফালি শেজে।
মিলনোত্সবে সেও তো পড়েনি বাকি,
নবান্নে তার আসন রয়েছে পাতা :
পশ্চাতে চায় আমরই উদাস আঁখি ;
একবেণী হিয়া ছাড়ে না মলিন কাঁথা।। 




একদা এমনই বাদলশেষের রাতে---
মনে হয় যেন শত জনমের আগে---
সে এসে সহসা হাত রেখেছিল হাতে,
চেয়েছিল মুখে সহজিয়া অনুরাগে ;
সে-দিনও এমনই ফসলবিলাসী হাওয়া
মেতেছিল তার চিকুরের পাকা ধানে ;
অনাদি যুগের যত চাওয়া, যত পাওয়া
খুঁজেছিল তার আনত দিঠির মানে।
একটি কথার দ্বিধাথরথর চুড়ে
ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী ;
একটি নিমেষে দাঁড়ালো সরণী জুড়ে,
থামিল কালের চিরচঞ্চল গতি ;
একটি পণের অমিত প্রগল্ভতা
মর্ত্যে আনিল ধ্রুবতারকারে ধ'রে
একটি স্মৃতির মানুষী দুর্বলতা
প্রলয়ের পথ দিল অবারিত ক'রে। 



সন্ধিলগ্ন ফিরেছে সগৌরবে ;
অধরা আবার ডাকে সুধাসংকেতে,
মদমুকুলিত তারই দেহসৌরভে
অনামা কুসুম অজানায় ওঠে মেতে।
ভরা নদী তার আবেগের প্রতিনিধি,
অবাধ সাগরে উধাও অগাধ থেকে ;
অমল আকাশে মুকুলিত তার হৃদি
দিব্য শিশিরে তারই স্বেদ অভিষেকে।
স্বপ্নালু নিশা নীল তার আঁখিসম ;
সে-রোমরাজি কোমলতা ঘাসে-ঘাসে ;
পুনরাবৃত্ত রসনায় প্রিয়তম ;
আজ সে কেবল আর কারে ভালবাসে।
স্মৃতিপিপিলিকা তাই পুঞ্জিত করে
অমার রন্ধ্রে মৃত মাধুরীর কণা ;
সে ভুলে ভুলুক, কোটি মন্বন্তরে
আমি ভুলিব না, আমি কভু ভুলিব না।।