দু-তিন দিন আগে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনার কথা যতবার মনে পড়ছে, ততবার মনের মধ্যে
বেশ কৌতুক অনুভব করছি... তাই ভাবলাম ঘটনাটা খুলেই বলি... আজ থেকে বছর
প্রায় ১৬ বছর আগে আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়তাম, আমাদের সাথে বেশ সুন্দর দেখতে
একটা মেয়ে পড়তো... মেয়েটির আমার বন্ধুত্ব ছিল না, কথাও বলতাম না খুব বেশি,
কারণ আমি ছিলাম বেশ মুখচোরা... এই কারণেই হয়তো টিউশনের অন্যসব ছেলেদের
থেকে বেশ পিছিয়ে ছিলাম... ফলে যা হয় আর কি... মেয়েটিও আমাকে মোটেই পছন্দ
করতো না... কিন্তু আশ্চর্যভাবে ওর প্রেমে পড়েছিলাম আমি... সে
সময় প্রেম মানে শুধু প্রেমই ছিল... স্কুলে যেতাম, সারাদিন ক্লাস, বাড়ি
ফিরতাম,পড়তে যেতাম... খুব সামান্য জীবন, খুব সামান্য দিন... বৃষ্টি যেমন
ভাবে আসে, যেমনভাবে রোদ আমাদের বাড়ির গেট ছাড়িয়ে উঠোনে এসে পরে, যেমনভাবে
আমাদের পাড়ায় সন্ধে নামত, ঠিক তেমনই প্রেম... অনেকটা গানের মতো... আসলে
কিছু কিছু মেয়ে অনেকটা গানের মতো হয়... এই যেমন এখন গান শুনতে শুনতে ভাবছি
ওর কথা... যাই হোক, সে আমাকে পছন্দ করতো না... আমি জানতাম, আবার নিজের কাছে
নিজের এই জানাটাই অস্বীকার করতাম... তারপর একদিন এল যখন সকলের সামনে খুব
অকারণেই অপমানিত হতে হল... খারাপ লেগেছিল, কষ্টও হয়েছিল খুব... কারণ,
অপমানটা ওই করেছিল... মুখ বুজেছিলাম, কিছু বলিনি... বাড়ি ফিরে ওর গান
শুনছিলাম, কারণ ও ছিল গানের মতো... সারাজীবনেও ভুলতে পারিনি সেই অপমানের
কথা... দু-তিনদিন আগে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দেখলাম ওকে... দেখে মনে হল
একটুও বদলায়নি... ও হয়তো আমাকে দেখতে পায় নি, না পাওয়াটাই স্বাভাবিক...
কিন্তু আমি ওকে দেখেছিলাম... এত গেল ওর কথা... কিন্তু, ওর বাবাকে আমি
চিনতাম, কিন্তু ওর বাবা ভদ্রলোক আমাকে চিনতেন না... এবার ভদ্রলোকের সাথে
আলাপ হল... আলাপ করিয়ে দিলেন একজন দাদা... আমার লেখার কথা জানালেন আমার
প্রাক্তন সহপাঠিনীর বাবাকে... আশ্চর্য হলাম, যে ভদ্রলোক দু-একটা মেলায়,
বিশেষ করে লিটল ম্যাগাজিনে আমার বইটি দেখেছেন, আমার কিছু লেখাও পড়েছেন...
বিশেষ করে একটি প্রসিদ্ধ পুজো সংখ্যায় আমার লেখা আর সাধারণ সংখ্যায় আমার
একগুচ্ছ প্রকাশিত কবিতাও লক্ষ্য করেছেন... সেই যাই হোক, বেশ কিছুক্ষণ কথা
বলার পর ভদ্রলোক এগিয়ে গেলেন মঞ্চের দিকে... মঞ্চে উঠে ভদ্রলোক নানা বিষয়ে
বক্তব্য রাখলেন...প্রাচীন বাংলা সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথ, বর্তমান বাংলা
কবিতা ইত্যাদি ইত্যাদি... ওনার মেয়েও মঞ্চের সামনে বসে বেশ মনোযোগ দিয়ে
শুনছিল... হাত্তালিও হচ্ছিল বেশ... আমি মঞ্চের থেকে বেশদূরেই ছিলাম...
ভদ্রলোকের বক্তৃতা শুনতে শুনতে ভাবছিলাম, সত্যিই তো! কোথা থেকে আসে কবিতা?
চারদিকে এত আড়ম্বর, এত সাজগোজ, এত কথা, এত শব্দ এর মধ্যেই কি বেঁচে থাকে
কবিতা? না কবিতা বেঁচে থাকে তার থেকে অনেক দূরে, সভা থেকে অনেক দূরে, কিছু
পুরনো জখমকে সঙ্গে নিয়ে, একা একা বেঁচে থাকে কবিতা, কিছু পুরনো গানকে সঙ্গে
নিয়ে...সত্যিই, আমরা কতো কম জানি... যদি ওই ভদ্রলোক জানতে পারতেন...