Sunday, March 22, 2015

মনে পড়ে ? (কবি - নিশান চ্যাটার্জ্জী)

বিতান
এসব দিনে স্বাগতার কথা মনে পড়ে ?


স্বাগতা পাশের বাড়ি,
স্বাগতা ওড়না মোছে মুখ
স্বাগতা পরমাগতা
স্বাগতা পরম প্রিয় সুখ,



স্বাগতা জানালা পথে
তোর দৃষ্টি সুবাসে উদ্বেল,
টিউশান পড়তে যায়,
বেপাড়ার ডি পি সরখেল,


স্বাগতা জানালা পথে
দোতলার ঘরে বন্ধ তুই,
বাগানে মল্লিকা ছিলো,
বাগানের কোণে ছিলো জুঁই।


বিতান
এসব দিনে স্বাগতার কথা মনে পড়ে ?


স্বাগতা চায়ের কাপে
স্বাগতা হাতের বিস্কুট
গোপনে কয়েকটি কথা,
স্বাগতা বলেছে অস্ফুট,


ওপার জানালা থেকে,
অপার দূরত্ব পার করে,
কিছু কিছু মেঘ প্রিয়
গাভীনের মত আজও চরে !


বিতান,
এসব দিনে স্বাগতাও বুঝি মুখ মোছে,
ওড়নায়।
এসব দিনে


স্বাগতার কথা মনে পড়ে ?

Friday, March 20, 2015

A story (by Dishani Roy)

Last night, she narrated a story to me.


She said,

"You emerged through an unknown sunset, while I sat on a cliff wondering who and what I am.
You were not calm, you were an engulfing storm.
You were not waves, you were a destructive tsunami.
You were not fire, you were the ashes.
You were not hunger, you were a drought.
You were not rain, you were a flood.
You flooded me, starved me, burnt me, drowned me, tormented me.
You were a curse upon me.
You were a captivating jail, a suffocating lunacy and an inevitable obligation.

You were my greed.
A thorn.
An unquenchable thirst.
An unkept promise.
A struggle.

Because, you were the ocean and I, a lonely island.
Because, you were the tune and I, the forgotten words.
Because, you were my love, but not my lover.
Forever."


She told me the story of her dead husband, her long-lost married life and her widowed existence.





(Dishani Roy - https://www.facebook.com/dishani.roy - posted this on her Facebook timeline on March 7 at about 1:30 am.)

A song (by Dishani Roy)

The unacknowledged music runs through your tired veins. You are the ever widening sky. Your undemanding heart beats in subtle rhythms.

While here, clouds shed their pain and tears drown me in an unfathomable ocean. The lyrics is my sadness and the earth, my refuge.

Two pains collided, two destinations explored and two fates destined.

Your sky and my earth meet and the horizon is our truth.
Your music and my lyrics unite and the song is our expression.
The truth and the expression is our love, our life.

If be it momentary, then leave it so,
If be our paths bifurcated, then leave it so,
For love me for a moment, and the moment will be true.




(Dishani Roy - https://www.facebook.com/dishani.roy - posted this on her Facebook timeline at about 1 am on March 20, 2015.)

I am fine without You (by Dishani Roy)

It has not been long. Only a matter of a decade- a short term of ten years. Since the day you left, I have not felt any difference. Same schedule. Same aspirations. Same lifestyle.
Only, you are not there. Doesn't matter much, though. Why would it, probably?
Do you know that I no longer play with cars and robots? I am calm now. I no longer paint cats and dogs on newly white-washed walls and have my usual tutorial classes, with me as the teacher. I am no longer destructive. I am no longer disobedient.
I have long hairs now, like the way you wanted it to be. I appear more womanly now. I do not day-dream.

I have evolved from what you had seen me to be, when you left.

But, why is it that all this while I have been searching for a whisper amidst all cacophony, a touch amidst all pain, a flower amidst all thorns? Was it hope or was it desperation?
Was it you or was it me?
Who was right and who, wrong?

Ma, ten years are short. I have a whole life to live without you.

You disappeared in the foggy road,
You never came back again.
You were the one who taught me to look at stars-
And now, you,yourself, is a star.
What, once, I called the PRESENT,
Is now a PAST-untold, unheard and forgotten.

I am not lonely.
I just don't have a mother.
Ma, I am fine.
I am really fine-
Without you.

22nd March. Again. You. Me. Us.





(DIshani Roy - https://www.facebook.com/dishani.roy - posted this on her Facebook timeline at about 4 am on March 21, 2015.)


(source: https://www.facebook.com/dishani.roy/posts/674879805973241)

Thursday, March 12, 2015

কোন সাহসে আমায় তুমি তুচ্ছ করো ? (কবি - শঙ্খ ঘোষ)

শর্ত ছিল অসম্ভবের ঘর দেখাবে

সেসব কথার সমস্ত রঙ এখন ফিকে 

ঘোড়াতে জিন, বলগা হাতে, পা রেকাবে

আসছি তবু আসছি আমি তোমার দিকে।

অতর্কিতেই পৌঁছব ঠিক ভালোয় ভালোয়

বনবাদাড়ে সঙ্গ এখন চাইনা কারো

ঘরখোয়ানো পথখোয়ানো নষ্ট আলোয়

দেখব কেমন আজও আমায় ভুলতে পারো।





(Rwiti Roy - https://www.facebook.com/rwiti.roy - posted this on her Facebook timeline on March 13, 2015.)

Sunday, March 8, 2015

বাবলু ফার্নান্ডেজ (লেখক - তুষার সেনগুপ্ত)

ছেলেবেলায় কারও নামের শেষে গোমেজ, ফার্নান্ডেজ ইত্যাদি পদবীগুলো দেখলেই মনে মনে কল্পনা করে নিতুম ধপধপে ফর্সা সুঠাম চেহারার কোনও বিদেশী মানুষকে। আমার বেশ কয়েকজন মুসলমান বন্ধুও ছিল। কিন্তু অপরিচিত হলেও আলি, হায়দার বা রহমান পদবীর মালিকদের কখনই আফগানিস্তান, ইরান-ইরাক এমনকি পাকিস্তানী বলেও মনে হত না, খুব বেশী হলে কল্পনায় বাংলাদেশ এলেও আসতে পারত। কিন্তু বাংলাদেশ কি আর বিদেশ হল? সেইতো আমাদের মতই ছোটখাটো চেহারার দু'বেলা মাছ ভাত খাওয়া কালোকালো লোকগুলো, যারা একটু অদ্ভুত টানে হলেও বাংলাতেই কথা বলে। সেতো আমাদের বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, মালদা কিম্বা আমার মতই বর্ধমানের লোকেরাও নিজস্ব অদ্ভুত টানেই কথা বলে। মুখ খুললেই আর বলে দিতে হবে না কার কোন জেলায় বাড়ি। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের সঙ্গে ছেলেবেলা থেকেই খুব ঘনিষ্ঠভাবে মেশার সুযোগ পেলেও খ্রিষ্টান সম্প্রদায় আমার কাছে অধরাই ছিল। গ্রাম বাংলার প্রতিটা জনপদে এক বা একাধিক মসজিদ চোখে পরলেও গির্জার সংখ্যা নেহাতই নগণ্য। কালনায় একটা গির্জা ছিল। বড়দিনে দূর্গাঠাকুর দেখার মত করেই প্রতি বছর যিশুঠাকুর দেখতে যেতুম। কাটোয়ায় চলে আসার পর বড়দিনের নিয়ম করে যিশুঠাকুর দেখতে যাওয়াটা বাদ পড়লো। ওই লম্বা লম্বা পায়ের পাতা পর্যন্ত ঝুলের সাদা গাউন পরা যিশুঠাকুরের পূজো করা পুরুতমশাই গুলোকে কেন যে পাদ্রী বলে সেটাও জানলুম অনেক পরে, কারণ সবাই ওই পুরুতমশাই গুলোকে ফাদার বলেই ডাকতো। ততদিনে ফাদার মানে যে বাবা সেটা জেনে গেছি। বাবার বন্ধু বা পিতৃস্থানীয় কাউকে কাকু, জ্যেঠু বা পিসেমশাই-মেসোমশাই সম্বোধনেই অভ্যস্ত ছিলুম। নিজের বাবা থাকতেও একটা বাইরের লোককে মানুষ কি করে বাবা বলে ডাকে বুঝতুম না। হলই বা ইংরেজিতে ফাদার, বাংলা মানেটা তো সেই বাবা-ই, নাকি?


চার্চের যিশুপুজোর পুরুতমশাই গুলোকে কেন যে পাদ্রী বলে আর তাদের ফাদার বলে ডাকার কারণটাও জানলুম বাবলু, মান আমাদের বাবলু ফার্নান্ডেজের সাথে পরিচয় হওয়ার পর। ক্লাস ইলেভেনে আমাদের স্কুলে ভর্তি হল। বেশ সুঠাম বেঁটেখাটো চেহারা, একমাথা ঝাঁকড়া কোঁকড়ানো চুল, কুচকুচে কালো রঙ, পুরো শরীর জোড়া জংলী আদিবাসীর ছাপ স্পষ্ট। ওর বাবার নাম ছিল বিশু টুডু, যার কথা জিজ্ঞেস করতেই নির্বিকার মুখে বাবলু বলেছিল, "মা বলে, ওইটে বেহেড মাতাল ছিল বটেক। পুটুস করি হাতির পায়ে পত্তেই, হুশ করে উপরে। মু দেখি নাই উঁয়াকে, মুর জন্মের আগেই........"


বাবলুর মুখেই শুনেছিলুম ওর বাবার দলা পাকানো দেহটা দেখেই মা ফুলমনি জ্ঞান হারিয়েছিল আর জ্ঞান ফিরতেই যাকে প্রথম চোখে পরেছিল তিনিই হচ্ছেন ফাদার ফার্নান্ডেজ, করজগ্রামের চার্চের পাদ্রী। সেই থেকেই সহায় সম্বলহীন গর্ভবতী ফুলমনি টুডুর আশ্রয়স্থল হল চার্চ আর ওই পাদ্রীর পদবীতেই পরিচিত হয়ে গেল বিশু টুডুর ছেলে বাবলু ফার্নান্ডেজ। ফাদার অবিশ্যি আদর করে নাম রেখেছিল ববি, ববি ফার্নান্ডেজ। কিন্তু একটু বড় হতেই ববি নামটা কেমন যেন মেয়ে মেয়ে মনে হয়েছিল বাবলুর। তাই নিজেই ফাদারের কাছে আবদার করে ববি থেকে বাবলু হয়ে গেছিল। পুত্র স্নেহে মানুষ করা বাবলুর আবদারে ফাদারও আপত্তি করেন নি, স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলেন বাবলু ফার্নান্ডেজ নামেই। নিজের নাম করনের ইতিহাস নিয়ে বাবলু মজা করে বলতো, "মা বলে, মু বড্ড ইঁচড়ে পাকা। মুর লিজের নামটিকে তাই লিজেই দিছি।"


আমাদের স্কুলের হোস্টেলেই থাকতো বাবলু। পড়াশুনার থেকে ফুটবলে নজর বেশি। পড়ার বইয়ের অক্ষরের থেকেও ফুটবল মাঠের সবুজ ঘাস বেশি আপন ছিল বাবলুর। পড়াশুনাতে একটু নড়বড়ে হলেও ফুটবল মাঠে অল্প দিনেই সকলের নজর কাড়লো। ক্লাসের শেষ পিরিয়ডের ঘণ্টা বাজতে না বাজতেই স্কুলের গেমস টিচারের কিনে দেওয়া বুটজোড়া হস্টেলের ঘর থেকে বগলদাবা করেই একদৌড়ে খেলার মাঠে। পায়ে বুট গলিয়েই গায়ের সার্ট খুলে খালি গায়েই মাঠের মাঝে। খেলা শুরুর বাঁশি পরতেই শুরু হত বাবলুর দৌড়, বল পায়ে অথবা বলের দখল নিতে অবিরাম দৌড়। বলের দখলদারি যেন বাবলুর জন্মগত অধিকার এবং সেই অধিকারকে কায়েম রাখতেই যেন বাবলুর এই জীবনপণ বাজি। বল পায়ে বাবলুর চকচকে ঘামেভেজা শরীরটা একেবেকে পেরিয়ে যেত বাকী সবাইকে। জীবনযুদ্ধের লং-ডিস্টেন্স রানে বাকী সবার অনেক পেছন থেকে শুরু করা দৌড়ের অসম প্রতিযোগিতার খামতি মেটাতেই যেন এই ফুটবল মাঠে সবাইকে পেছনে ফেলে দেওয়ার এক অদম্য ইচ্ছে ফুটে বেরত বাবলুর চোখে মুখে, পায়ের পেশিতে আর দু'গাল বেয়ে চিবুক থেকে পরতে থাকা ঘামের প্রতিটা ফোঁটায়।


****************************************


দেখতে দেখতে বছর ঘুরে গেল। কয়েক মাস পরেই হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা। সবার মধ্যেই পরীক্ষার প্রস্তুতির ব্যস্ততা কিন্তু বাবলুর কোনও হেলদোল নেই। পরীক্ষার প্রস্তুতির কথা বলতেই অদ্ভুত তাচ্ছিল্যের স্বরে বলতো, "মা বলে, মু উই করব বটেক, যিটা মুর ইচ্ছা।"


বাবলুর প্রতিটা কথা এই "মা বলে" বলে শুরু করার অভ্যাসটা আমার ভারি অদ্ভুত লাগতো। আর পাঁচটা আড্ডাবাজ বাঙালী ছেলের মতই আমরাও ততদিনে কথার শুরুতে দু অক্ষরের অশ্লীল মাত্রাগুলো আয়ত্ত করে ফেলেছি, কিন্তু আমাদের দলে ওই জংলী, আদিবাসী ভাষায় কথা বলা বাবলু ছিল একেবারেই ব্যতিক্রম। আমাদের সভ্য ভাষা আয়ত্ত করার প্রতি ওর যেমন অনীহা ছিল ঠিক তেমনই আমাদের পুরুষোচিত গর্বের অশ্লীল মাত্রগুলোর প্রতিও বাবলুর ছিল স্বতঃস্ফূর্ত অবজ্ঞা। ততদিনে ফুটবলার হিসেবে বাবলুর নাম জেলা ছাড়িয়ে রাজ্যস্তরে পৌঁছে গেছে। অনূর্ধ্ব উনিশ বাংলা দলের ট্রায়ালে ডাক পেল বাবলু আর আমরা ব্যস্ত হয়ে গেলুম পরীক্ষার প্রস্তুতিতে।


পরীক্ষা শেষ, বাবলু ছাড়া সবাই পরীক্ষা দিলুম আর বাবলু সেই সময় বেঙ্গল জুনিয়ার টিমের হয়ে খেলতে গেল কেরলে। পরীক্ষার রেজাল্ট বেরতেই সবাই ছিটকে গেলুম বিভিন্ন দিকে। কেউ ইঞ্জিনিয়ারিং, কেউ মেডিকেল, কেউ কেউ কলকাতার বিভিন্ন কলেজে আর বাবলু ততদিনে পা দিয়ে ফেলেছে ফুটবলার হিসেবে ওপর দিকে ওঠার প্রথম সিঁড়িতে। তারপর আরও অনেক দিন দেখা হয়নি বাবলুর সাথে। অবিশ্যি মাঝে মাঝে খবরের কাগজে চোখে পরত বাবলুর নাম। কলকাতার বড়দলে খেলছে, ইন্ডিয়ার হয়ে দেশের বাইরেও খেলতে গেছে বেশ কয়েকবার। বন্ধুদের মুখেই শুনেছিলুম কোন একটা ব্যাংকেও চাকরী পেয়েছে, খেলার জন্যেই। বাবলুর জন্যে মনে মনে গর্ব হত। ভাবতুম ও এখনও ওই সাঁওতালী ভাষাতেই কথা বলে কিনা অথবা এখনও ওর প্রতিটা কথা শুরু করার আগে সেই "মা বলে" বলার অভ্যাসটা আছে কিনা।


****************************************


বাবলুর সাথে যে আবারও কোন দিন একেবারে সামনা সামনি দেখা হয়ে যাবে ভাবতেই পারিনি। সুযোগটা এসে গেল আমাদের স্কুলের ১২৫তম বর্ষ উদযাপনের অনুষ্ঠানে। পুরনো, হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের খুঁজে পাওয়ার লোভেই গিয়ে বসলুম একেবারে পেছনের সারির একটা চেয়ারে। অসংখ্য অপরিচিত মুখের মধ্যেও বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতই মাঝেমাঝে ঝলক দিয়ে যাচ্ছে অস্পষ্ট কিছু পরিচিত মুখ আর তার হাত ধরেই খুঁজে ফেরা সেই রঙিন রাংতায় মোড়ানো ফেলে আসা বা হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো। আরও অনেক কৃতি ছাত্রের সঙ্গে বাবলুও আজকের অনুষ্ঠানের আমন্ত্রিত অতিথি। নাম করা ফুটবলার! আমাদের স্কুলের অনেক প্রক্তনিই আজকের নামজাদা ডাক্তার, সায়েন্টিস্ট অথবা শিক্ষাবিদ কিন্তু বাবলুর মত বিখ্যাত কেউ নয়। বাবলুই আজকের অনুষ্ঠানের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে। ওকে কি করে হাতের সামনে পাওয়া যায় সেটাই ভাবছি। আজকের এই স্তাবকতাময় জগতে বাবলু নিশ্চয় স্তাবকদের ঘেরাটোপে হারিয়ে গেছে, এই সব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ পিঠে অনুভব করলুম কার যেন ছোঁয়া। চমকে ঘাড় ঘোরাতেই আরও অনেক চেনা মুখের মাঝে সেই পরিচিত চকচকে চোখ, যেটা দেখলেই চিনে নেওয়া যায় বাবলু ফার্নান্ডেজকে। মাথার ঝাঁকরা চুল উধাও হয়ে বেশ কিছুটা মসৃণ টাক আর হালকা ভুঁড়ি স্বত্বেও এক নজরেই চেনা যায় বাবলুকে। ঘোর কাটিয়ে ধীর পায়ে ওদের দিকে এগিয়ে গিয়ে বাবলুর কাঁধে হাত রেখে প্রথমেই অদ্ভুতভাবে কুশল বিনিময় না করেই অথবা ওর পরিবারের কথা বাদ দিয়ে সেই বোকাবোকা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নটাই করে বসলুম, "তুই এখনও সেই সাঁওতালী ভাষাতেই কথা বলিস?"


- "কেন বে? তুর অসুবিধা আছে বটেক?"


বাবলুর স্বতঃস্ফূর্ত উত্তরে সবই হেসে উঠতেই সসংকোচে জিজ্ঞেস করলুম, "বিয়ে করেছিস? ছেলে মেয়ে? আর তোর মা?"


"হ্যাঁ বিয়ে করেছি, একটাই ছেলে।"  বলেই অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার চোখে চোখ রেখে কাঁপা কাঁপা গলায়, পরিষ্কার আমাদের ভাষায় বলল, "বাপটা গেছিলো জন্মের আগেই আর মাও আমার হাঁটতে শেখার আগেই। প্রথম পা ফেলেছি ফাদারের হাত ধরে, ফাদারের মুখেই শুনেছি বিশু আর ফুলমনি টুডুর গল্প। বাপকে দেখিইনি আর মাকেও মনে পড়েনা....."


- "কিন্তু তোর যে ওই প্রতিটা কথা বলার আগে 'মা বলে' দিয়ে শুরু করা...."


আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই চাপা হিসহিসে স্বরে যেন স্বগতোক্তি করল বাবলু, "ওটা বললে মাকে সব সময় পাশে অনুভব করতাম, মনে জোর পেতাম আর সেদিনও আমি তোদের ভাষাতেই কথা বলতে পারতাম কিন্তু ইচ্ছে করেই কথা বলতাম আমার সেই কোনও দিনও চোখে না দেখা আসল বাবার ভাষাতেই আর ওতেই অদৃশ্য ছোঁয়া পেতাম বিশু টুডুর হাতের...."


বলেই হনহন করে এগিয়ে গিয়ে জন সমুদ্রে হারিয়ে গেল আমাদের সেই জংলী আদিবাসী বন্ধু বাবলু ফার্নান্ডেজ।





(Tushar Sengupta - https://www.facebook.com/tushar.sengupta.7 - posted this on his Facebook timeline on March 9, 2015.)

আমার পরিচয় (কবি - সৈয়দ শামসুল হক)

আমি জন্মেছি বাংলায়
আমি বাংলায় কথা বলি।
আমি বাংলার আলপথ দিয়ে, হাজার বছর চলি।
চলি পলিমাটি কোমলে আমার চলার চিহ্ন ফেলে।
তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে ?



আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে
আমি তো এসেছি সওদাগরের ডিঙার বহর থেকে।
আমি তো এসেছি কৈবর্তের বিদ্রোহী গ্রাম থেকে
আমি তো এসেছি পালযুগ নামে চিত্রকলার থেকে।



এসেছি বাঙালি পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার থেকে
এসেছি বাঙালি জোড়বাংলার মন্দির বেদি থেকে।
এসেছি বাঙালি বরেন্দ্রভূমে সোনা মসজিদ থেকে
এসেছি বাঙালি আউল-বাউল মাটির দেউল থেকে।



আমি তো এসেছি সার্বভৌম বারোভূঁইয়ার থেকে
আমি তো এসেছি ‘কমলার দীঘি’ ‘মহুয়ার পালা’ থেকে।
আমি তো এসেছি তিতুমীর আর হাজী শরীয়ত থেকে
আমি তো এসেছি গীতাঞ্জলি ও অগ্নিবীণার থেকে।



এসেছি বাঙালি ক্ষুদিরাম আর সূর্যসেনের থেকে
এসেছি বাঙালি জয়নুল আর অবন ঠাকুর থেকে।
এসেছি বাঙালি রাষ্ট্রভাষার লাল রাজপথ থেকে
এসেছি বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর থেকে।



আমি যে এসেছি জয়বাংলার বজ্রকণ্ঠ থেকে
আমি যে এসেছি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে।
এসেছি আমার পেছনে হাজার চরণচিহ্ন ফেলে
শুধাও আমাকে ‘এতদূর তুমি কোন প্রেরণায় এলে ?



তবে তুমি বুঝি বাঙালি জাতির ইতিহাস শোনো নাই-
‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’
একসাথে আছি, একসাথে বাঁচি, আজো একসাথে থাকবোই
সব বিভেদের রেখা মুছে দিয়ে সাম্যের ছবি আঁকবোই।



পরিচয়ে আমি বাঙালি, আমার আছে ইতিহাস গর্বের-
কখনোই ভয় করিনাকো আমি উদ্যত কোনো খড়গের।
শত্রুর সাথে লড়াই করেছি, স্বপ্নের সাথে বাস;
অস্ত্রেও শান দিয়েছি যেমন শস্য করেছি চাষ;
একই হাসিমুখে বাজায়েছি বাঁশি, গলায় পরেছি ফাঁস;
আপোষ করিনি কখনোই আমি- এই হ’লো ইতিহাস।



এই ইতিহাস ভুলে যাবো আজ, আমি কি তেমন সন্তান ?
যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান;
তারই ইতিহাস প্রেরণায় আমি বাংলায় পথ চলি-
চোখে নীলাকাশ, বুকে বিশ্বাস পায়ে উর্বর পলি।

Monday, March 2, 2015

উন্মাদের পাঠক্রম - ২৩ (কবি - নিশান চ্যাটার্জ্জী)

যে শিশু জন্মের পর কুকুরের ভোগে 
অথবা যে বুড়োটি থাকে বয়েসের রোগে,

সকলে জেনেছে কিছু মিছিমিছি কথা
জেনেছে সুখের নাম, অবসাদ, ব্যথা।


দুপুরেরও আগে
অযথা বিড়াল মাতা কেঁদে কেঁদে জাগে


পানিও বহতা, হাওয়া, সময়েরই মত
বেড়েছে সহসা।
তীব্র চাবুকেরই মত,


বিপাশা মেঘনা পদ্মা যমুনার জলে
ভেসে যায় ভেসে যায় আদরের ছেলে


বিকেলেরও পরে
কখানি বেকার কথা বৃথা জলে মরে।


মেয়েটি আঁচলে রাখছে কি গোপন কথা,
ছেলেটি বাক্স ভরে কি আপন ব্যথা,


লুকিয়ে রাখছে, আরো লুকোতে লুকোতে,
রাখে, নাগরিক ক্ষত যারা শুকোতে শুকোতে,


প্রজাপতি রঙে
মেয়েটির পিঠ জোড়া প্রজাপতি রঙে


আশ্রয় নিয়েছে, থাকছে বিবশ অভাবে।
তাদের গৃহটি পূর্ণ শ্মশান স্বভাবে।


এমনই প্রত্যেক রাত মায়া ছায়া থাকে
এমনই প্রত্যেক রাত তারা সব জাগে


তারাও জেনেছে সৃষ্টি মাদকতাময়
যে ঘ্রাণ এনেছে বয়ে হাওয়ায় হাওয়ায়।

বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে (কবি - শামসুর রাহমান)

বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে নিকানো উঠোনে ঝরে
রোদ , বারান্দায় লাগে জ্যোৎস্নার চন্দন । বাংলা ভাষা
উচ্চারিত হলে অন্ধ বাউলের একতারা বাজে
উদার গৈরিক মাঠে , খোলা পথে , উত্তাল নদীর
বাঁকে বাঁকে , নদীও নর্তকী হয় ।যখন সকালে
নতুন শিক্ষার্থী লেখে তার বাল্যশিক্ষার অক্ষর ,
কাননে কুসুম কলি ফোটে , গো রাখালের বাঁশি
হাওয়াকে বানায় মেঠো সুর , পুকুরে কলস ভাসে ।
বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে চোখে ভেসে ওঠে কত
চেনা ছবি ; মা আমার দোলনা দুলিয়ে কাটছেন
ঘুম পাড়ানিয়া ছড়া কোন সে সুদূরে ; সত্তা তার
আশাবরী , নানী বিষাদ সিন্ধুর স্পন্দে দুলে
দুলে রমজানী সাঁঝে ভাজেন ডালের বড়া , আর
একুশের প্রথম প্রভাত ফেরী-অলৌকিক ভোর ।

আলোচনা -- দয়াময়ীর কথা : সুনন্দা সিকদার (লেখিকা - মৌসুমী কাদের)

বোধের দৃষ্টি দিয়ে কেউ যখন লেখে তখন তার ভাষার কারুকাজ প্রয়োজন হয়না, আকাশটা যেন এমনিই খুলে যায়। সময়ের দূরত্বগুলো তখন গভীরে ভাষার কলোরব হয়ে বাজে.... ‘ঝিক ঝিক ঝিক ময়েংসি, ঢাকা যাইতে কতদিন, এক মাস তেরো দিন...কু...উ...উ’... শৈশবের ১০ টি বছর এতটাই স্পষ্ট করে আগলে রেখেছিলেন দয়া। যে আস্তরটি চোখে পড়েছে, সেটি কেবলমাত্র সময়ের প্রলেপ। পরবর্তী জীবনে চল্লিশ বছর পশ্চিমবঙ্গে কাটিয়েও এই গভীর মর্মস্পর্শী স্মৃতিগুলোতে এতটুকু চির ধরেনি। আর এইসব স্মৃতিকথার চমৎকার গ্রন্থন এই ‘দয়াময়ীর কথা’ ।


কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৮ সালের লীলা পুরষ্কার এবং ২০১০ সালে আনন্দ পুরস্কার পাওয়া বই ‘দয়াময়ীর কথা’। লেখক সুনন্দা সিকদার। জন্মেছেন ১৯৫১ সালে। শৈশবের দশটি বছর কেটেছে নিঃসন্তান পিসিমার কাছে পুর্ব বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। ১৯৩০-১৯৬০ সালের পূর্ববাংলার ময়মনসিংহ জেলার হিন্দু-মুসলমানদের সমাজ চিত্র তুলে ধরেছেন তিনি এই বইয়ে। পরবর্তীতে ১৯৬১-তে পশিমবঙ্গ ফিরে যান তিনি। আর তখন থেকে শুরু হয় তার শহুরে জীবন। কিন্তু শেকড়ের সাথে মিশে বেঁচে থাকে যারা, তারা কোনদিন পরবাসী হয়না। তিনি ছিলেন মিলে মিশে একাকার হয়ে যাওয়া এক অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিনিধি ।


ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ময়মনসিংহের মানুষের টানটাই বোধহয় এমন। দূর সম্পর্ককেও আপন করে নেবার অদ্ভুত এক ক্ষমতা আছে এদের । হয়ত একারনেই সুনন্দার মতন অনেক মাসী, কাকীমা অথবা দিদি, দিঘপাইত গ্রামে দয়াময়ী হয়ে বেঁচে আছেন। সুনন্দার লেখায় যখনই জামালপুর, সরিষাবাড়ীর গল্প এসেছে...ছবির মতন সেই সব দৃশ্যপট আত্মীয়তার সূত্রে বেঁধে ফেলেছে। নান্দাইল, কেন্দুয়া, জামালপুর, সরিষাবাড়ী, গফরগাঁও...কত পরিচিত নাম। হেটে হেটে মফঃস্বল শহর গুলো সেইযে দেখা, আজো যেন চোখ বুজলেই স্মৃতির ভার নুয়ে পড়ে । স্মৃতিগুলো এমনি প্রখর যে, এর ইতিহাস যারা খুলে নেড়েচেড়ে বলেন, তাদের ভক্ত হয়ে যাই । সুনন্দা’র লেখাটি তেমনই একটি লেখা, যা কেবল ওর একার স্মৃতিকথা নয়; এ অনেকের কথা, একটি অসাধারন অসাম্প্রদায়িক খন্ডচিত্রের প্রতিনিধি । সামগ্রিকভাবে দেশভাগ, বিভাজন, - বিষয় হিসেবে অনেক বড় প্রেক্ষাপট । কিন্তু তার চেয়ের প্রখর সত্য খন্ডিত হয়ে পড়া বাংলার মানুষ, লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া অনেকগুলো পরিবার, উপচে পড়া ক্ষত। আর এইসব ছিন্নমূল মানুষের রক্ত দিয়ে লেখা হয়েছে এই অবিস্মরনীয় সাহিত্যটি ।


১৯৫১ থেকে ১৯৬১ সালের পুর্ববাংলার শৈশবস্মৃতি- এই মেয়েটির । নিঃসন্তান পালক মা (পিসিমা) এবং মুসলমান চাকর মাজম দাদার কাছে বেড়ে উঠেছেন দয়াময়ী দিঘপাইত গ্রামে । পরবর্তীতে আগেই পশ্চিমবঙ্গে চলে যাওয়া গর্ভধারিনী মা ও বাবার কাছে ফিরে যান তিনি। কিন্তু শৈশবের স্মৃতির তীব্রতা ভাসিয়ে রেখেছে তাকে বাকি জীবন। আজমদাদা, মাজমদাদা, সমসেরচাচা, রাধিয়াদি, ঝুমিয়াদি, ভুলিপিসিমা, এরা সবাই সেই স্মৃতির মানুষজন…


প্রগাঢ় স্নেহ দিয়ে যিনি লতার মতন বেড়ে তুলেছিলেন দয়াকে, সেই পালিকা মা, সেই পিসিমা’র নাম ছিল স্নেহলতা। শেয়ালের মুখ থেকে বেঁচে এসেছিলেন ১ মাসের স্নেহলতা। সেই বেঁচে যাওয়া ভাগ্যবতীই আবার শিশু বয়েসে বিধবা হন। কোনো শুন্যতার বোধ স্নেহলতার ছিলনা। কেবল বহুযুগ আগে দেখা এক বলিষ্ঠ তরতাজা অথচ মৃত যুবক সারাজীবন তাকে নিয়ন্ত্রন করে গেছে। উর্বর জমিতে তর তর করে সবুজ বৃক্ষরাশিকে বেড়ে তোলা ছাড়া আর কোন সত্য ছিলনা তার জীবনে । হিন্দুস্থান পাকিস্থান যখন আলাদা হোল, দয়ার বাবা অন্নদা আর মা সুপ্রভার হিন্দুস্থানে চাকরী হয়ে গেলে, ওরা তখন দেশ ছাড়ল। আর নিয়তী দয়াকে দিয়ে গেল স্নেহলতার কাছে। ঠিক সেই সময়টিতেই দিঘপাইত গ্রামে হিন্দু মুসলমান আর চাষাভুষোদের উপচে পড়া মায়ার বাঁধলেন ‘দয়া’। ষাট বছর বয়েসী প্রৌঢ় স্নেহলতা ৮ মাস বয়েসী এই দয়াকে পেয়ে নাওয়ানো, খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, অসুখ-বিসুখের দায় নিতে নিতে গোপন স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে রইলেন। জীবনের দশটা বছর দয়া যা কিছু শিখেছেন, ধারন করেছেন তার অনেকটা জুড়েই ছিলেন এই স্নেহলতা। নামের সংগে মায়ামমতার সখ্যতা ছিলতো বটেই। চোখের ভেতর অন্য চোখটি দিয়ে স্বপ্ন বুনতে চাইতেন তিনি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিয়তীর কাছে হার মানতে হোত তাকে।


দয়াময়ীর জীবনে আরেকজন নারীর স্থায়ী প্রভাব পড়েছিল। তিনি হলেন ভুলিপিসিমা । তার পালিকা মায়ের ননদ, যিনি ছিলেন দশ বছরের বিধবা । এই বিধবা শিশুটি নিজের চেষ্টায় অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে লিখতে পড়তে শিখেছিলেন। আজন্ম একটা শিক্ষিত মন নিয়ে জন্মেছিলেন তিনি । কোথা থেকে এইরকম মুক্ত অন্তঃকরণ একটা মন পেয়েছিলেন সেটা ছিল দয়ার কাছে একটা পরম বিস্ময়। নিজের জীবনে কিছু না পেয়েও তার এতটুকুন দৈন্যতা ছিলনা। আশ্রমে আশ্রমে আর স্টেশনে স্টেশনে জীবন কাটানো এই নারী ছিলেন দয়ার চিন্তার চিরকালীন সংগী।


হিন্দু মুসলমান বা দেশভাগের গল্প নতুন কিছু নয়। তবু কেন সুনন্দা তার লেখায় অসাধারন হয়ে উঠলেন? কারন তিনি প্রকৃতিকে ঘিরে এক অনন্য ইতিহাস এঁকেছেন। সময়কে দেখেছেন চোখ মেলে ভীষন কাছ থেকে, অনুভূতিটা ছিল আরো আরো গভীরে । মা-বাবা, ভাই বোন বা পালিকা মায়ের সাথে দূরত্ব ছিল একটি স্বাভাবিক ঘটনা । তার চেয়েও বড় এবং অনেক বলিষ্ঠ ছিল ‘স্নেহলতা-দয়া-ভুলি’ এই তিন নারীর সংগ্রামী অথচ বোধসম্পন্ন জীবন। একে অন্যের কাছে শিখেছেন, দিয়েছেন তার চেয়ে বেশী। সুনন্দা তাদেরকেই যূথবদ্ধ করেছেন সহজ ভাষায়, কাঁচের মতন, স্বচ্ছ এবং প্রানবন্ত।


আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র দয়ার পাশে ছায়া হয়ে ভেসে ছিল। মাজমদাদা। হিন্দু মুসলমানের তখন পার্থক্য ছিল, বেদনা ছিল, অসমতা ছিল। আবার অন্যদিকে মাজমদাদার মতন তীব্র ভালোবাসাও ছিল। সেইযে মাজম দাদার কাঁধে চড়ে বংশ নদীর ধারে বেড়াতে যাওয়া, চিনতে শেখা দন্ডকলসের ঝাড়, নানারকম ঘাসফুল, চুলের মুঠি ধরে ঝুলে ঝুলে শরীরটাকে দেখতে পাওয়া, সেইযে বুকে পিঠে গায়ে কোথায় জড়ুল আর তিল, বুক ভরা লোম, সেগুলো কি সহজে ভোলা যায়? দাদাই শিখিয়েছিলেন; আল্লাহর সঙ্গে দূর্গা–লক্ষীর কোন ঝগড়া নেই। বেহেশতে সকলের মধ্যেই ভালোবাসা। কাইজা করে মানুষ। মাজমের এই ভালোবাসার ধর্মবোধ দয়াকে প্রভাবিত করেছিলতো বটেই। ‘সুনন্দা সিকদার’ হয়ে উঠবার প্রথম তাগাদা বোধকরি এই মাজমদাদার মৃত্যু থেকেই । সেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের পর যখন মাজমদাদার মৃত্যুর খবর এলো, বুকের মধ্যে যা কিছু বেদনার পাহাড় লুকানো ছিল, তা তর তর করে যেন বেড়িয়ে এলো। মৃত্যু্র খবরটা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে তিরিশ বছরের স্মৃতিকথাগুলো গলে গলে কান্নার স্রোত হয়ে বেড়িয়ে এলো সুনন্দার লেখায়।


মাজম দাদার মতন আরো রয়েছে আজম দাদা, কালাজিরা চাল, হাঁসখোলের ভাত… সোনটিয়া, হরিদ্রাটা, বংশনদী অথবা দিঘপাইত জুনিয়ার হাই ইসকুল । এই সকল ভিটেমাটির কথা, গরুবলদের কথা মনে হলে পূর্বজন্মেরা প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরে। অস্তিত্বেরা গোগ্রাসে গিলে খেতে থাকে পরিচয়। মনে হয়, আবার ফিরে যাই সেই পরিত্যক্ত ভিটেয়। দয়ার যেন ঠিক তেমনটাই ঘটেছিল। মানুষকে তিনি ছিড়ে খূঁড়ে দেখেছেন; কখনও হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান কিছু হতে পারেননি বা চাননি। বিবেক যখন সীমাহীন আকাশকে ছূঁতে পায় তখনই বোধহয় ধর্ম পরিচয়টি বিলুপ্ত হতে শুরু করে। দয়াময়ী সেইরকম একজন অসাম্প্রদায়িক চরিত্র ।


দয়ার জন্মের কয়েক বছর আগে নোয়াখালীতে যে দাঙ্গা হয় ওখানে হিন্দুদের উপর মুসলমানেরা ভীষন অত্যাচার আর জুলুম করেছিল। মুসলমানদের উপর হিন্দুরা অপঘিন্না করেছে দীর্ঘকাল। হিন্দুরা মুসলমানদের ঘরে ঢুকতে দিতনা, তাতে জাত যাবে বলে; দাওয়ার বাইরে বসিয়ে খেতে দেয়া, আলাদা হুকো, আলাদা বাসন...এই চর্চা চলেছে অনেকদিন। তারই প্রতিশোধ ছিল কি এই দাঙ্গা? এইসব বড় বড় চিন্তার বিষয় গুলো মাথায় ধারন করে দয়া বেড়ে উঠেছিল। আর সেকারনেই নানা রকম গোপন অপরাধ করতে ওর দ্বিধা হয়নি। গল্পের বর্ননায় একবার তিনি বলেছেন; ‘আমি রাধিয়াদির রান্না অনেক কিছু খেতাম। ওদের চালের খুব অভাব, সেই জন্যে ওরা পেঁয়াজ দিয়ে কচুরলতি চচ্চড়ি করত ঝাল করে। …প্রথম যেদিন আমি ওদের বাড়ি কচুরলতি চচ্চড়ি খাই, সে দিন ওই অপরাধ করে এসেই স্লেটে সে কথা লিখেছিলাম।… স্লেটে লিখলে পাপটা বোধহয় কমে যেত, আর লিখতে পেরে খুব আনন্দও হত।… ঝুমিয়াদি আমায় বলল,… ‘তুমি খাও, দয়া। এখনও তর আট বছর বয়স হয় নাই, তর কুন পাপ হবে না। আর একশো আটবার নারায়ণ লিখবি সেলেটে, সব পাপ ধুইয়া যাইব গা।’


১৯৪৭ সালে আরো তীব্রভাবে শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ। কেবলমাত্র অর্থনৈতিক নয়, বাঙ্গালী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপরও নিপীড়ন শুরু হয়। বড্ড অস্থির ছিল ঐ সময়টা। চারপাশের দৃশ্যপট পালটে যাচ্ছিল দ্রুত, পুর্ববঙ্গ ছেড়ে হিন্দুরা তখন চলে যাচ্ছে হিন্দুস্থানে । আবার উত্তরবঙ্গ থেকে বাড়িজমি বদল করে পুর্ববঙ্গে আসছে যে মুসলমান– ভূমিপুত্রদের সঙ্গে তাঁদের এক করে দেখছেন না কেউই। এই সময়টাতে মৈমনসিংহ বা জামালপুর শহর থেকে ইত্তেফাক কাগজ আসতো। জওহরলাল নেহরু আর আইয়ুব খানের সম্পর্ক কেমন দাঁড়াচ্ছে তার উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতেন পিসিমা। এদের ভাব ভালোবাসা কোনদিন ভাল হোলনা আর পিসিমারও পাসপোর্ট ভিসাহীন দেশ দেখা হোলনা। জমিদারবাবুরা তখন মানুষের অন্ন নিয়ে রাজনীতি করতেন। অন্যায় শাসন করে নিয়ন্ত্রন করতেন সাধারন মানুষের জীবন। কিন্তু বিদ্যাচর্চা নিয়ে তাদের মাথাব্যাথা ছিলনা। দিঘপাইত গ্রামটা যে একটা মুসলমান রাষ্ট্র, এই বোধটা গ্রামের কেউ জানতনা তীব্র করে। দিঘপাইত গ্রামে ধর্ম, জাত, এইসব বিষয় গুলো ছিল জোরালো । ইস্কুলের ধর্ম পরীক্ষায় পুরোহিতের ছেলে কানু আর মৌলভীসাহেবের ছেলে জমিরুদ্দিনকে হারিয়ে দয়া’র ফার্স্ট হয়ে যাওয়ার রহস্যটি আর কিছুই নয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে ইয়াদালীকাকা আর সুবহানদাদার কাছে ধর্ম বিষয়ে জ্ঞানচর্চা এবং কোন ধর্মকে যে ছোট করে দেখতে নেই সেইটি বোধের মধ্যে ধারন করতে শেখা তখনি। ইয়াদালীকাকার কাছেই বুদ্ধদেব সম্পর্কে জানা, ‘সব মানুষই সমান, জাতপাত মানুষের তৈরী’ এই বোধ ধারন করতে করতেই দয়া বড় হয়েছে। যীশুখৃষ্ট কিভাবে মানুষকে ভালোবাসার কথা বলেছেন সুবহানদাদা সেই বর্ননাও করেছেন। তারপরও কি কারনে হিন্দুস্থান-পাকিস্থানের এই সব জাত এবং ধর্মের বিভেদ ছিল, সেই সব কঠিন সংকট এবং মনোবৈকল্যের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে রইলেন দয়াময়ী।


নানা ঘটনার ধারাবাহিকতায় দিঘপাইত গ্রাম থেকে বিশ্বাসবাড়ির ঠাকুমা, ঘোষবাড়ির খুকিপিসিমা, চোদ্দগন্ডার জেঠিমা সকলে কাঁদতে কাঁদতে হিন্দুস্থানে চলে গেলেন। গরু গাড়ীতে করে চলে গেল থালাবাসন, কাঁঠালকাঠের পিড়ি, পোটলা ভর্তি চিড়ে-মুড়ি, ট্রাঙ্ক, শতরঞ্জি; সেই সব বদলে যাওয়া দৃশ্যপট আঁকড়ে ধরেছিলেন দয়া। আজমদাদা, মাজমদাদারা ছিলেন বর্গা চাষী । কমুঠো লাল হাঁসখোলের ভাতের জন্যে এরা কায়েতদের পায়ে পড়ছিল তখন । মুসলমানেরা নিজেদের জমি চাষ করলেও হিন্দুরা তা করেনি, কারন তাতে করে তাদের জাত যেত। আর সেই সময়ে হিন্দু জমিদাররা বর্গা দিতে চাইলে গরুর সংখ্যা গুনে গুনেই তবে বর্গাচাষী বাছাই করা হোত। এইরকম এক অস্থির সময়ে মুসলমান চাষী আজমদাদার কষ্ট নিজের চোখে দেখেছেন দয়া। উপলব্ধি করেছেন ইতিহাসের করুন উপহাস। পিসিমা খুব চেয়েছিলেন দয়া লেখাপড়া করুক। কিন্তু দিঘপাইত গ্রামে মেয়েদের ইস্কুল নেই বলে তার আর পড়া হোলনা। গ্রামের ছেলেরা চিৎকার করে পড়ত আর সেই শুনে শুনে দয়ার পড়া মুখস্ত হয়ে যেত। দুই থেকে উনিশের নামতা, হাজি মোহাম্মদ মহসিন, কায়েদে আজম জিন্না, বেগম রোকেয়া সব ছিল খুব পরিচিত নাম। জসীমউদ্দিনের ‘রুপাই’ কবিতা মুখস্ত ছিল তার। হয়ত সেই থেকেই লেখার বোধটা তৈরী হতে শুরু করে দয়া’র। আর প্রতিটি দৃশ্যকল্প গোপনে মালা গাঁথতে থাকে। বাংলা সাহিত্যে দেশভাগের সময়ের এইরকম মায়াময়ী স্বচিত্র বর্ননা একটি অনন্য দৃষ্টান্তই বটে।


দীঘপাইত গ্রামে যখন গোল্লাছুট খেলা হোত, অথবা জাম্বুরা বা বাতাবিলেবু দিয়ে বল খেলা হোত তখন জাতপাত আলাদা করা যেতোনা। যখন একটা বড় গাছের তলায় বসে কিতাব বা পুথিপাঠ হত, তখনও গল্পের টানে অথবা গল্পের জাদুতে জাতপাত, ছোঁয়াছুঁয়ির কথা ভুল হয়ে যেতে দেখেছে দয়া। গর্ভধারিনী মা, বাবা, বা ভাই-বোনকে কখনো তার সুখ বা দুঃখের অংশ করতে পারেনি সে। তার পুরো জীবনটাই ঘিরে রেখেছিল এই ‘দিঘপাইত গ্রাম’। দশটি বছর ধরে গড়ে উঠেছে এই স্মৃতি, যেটা কেবল তার একার, কাউকে সেকথা বলা যায়না। নিজের দেশ নিয়ে পরবর্তীতে বাকিটা সময় এটি অনুচ্চারিতই থেকে যায়। পালিকা মায়ের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দয়া সেকথা উচ্চারন করেননি।


পুরষ্কার পাবার পর ‘দয়াময়ী’ অর্থাৎ আমাদের ‘সুনন্দা সিকদার’ ২০০৯ সালে ফিরে গিয়েছিলেন সেই দিঘপাইত গ্রামে। কতযে বদলে গেছে গ্রামটি। স্কুলে এখন টিনের চাল। চাষীরা বছরান্তরে ভাল ধান পায়, এখন আর আগের মতন চাল কিনে খেতে হয়না। গ্রামবাসীদের জীবনযাত্রাও বদলে গেছে। সবচেয়ে আশ্চর্য হোল হিন্দু মুসলমানদের সেই পার্থক্য অনেকটাই যেন মিইয়ে গেছে। অনেকেই তাকে বলেছে যে ১৯৭১ বদলে দিয়েছে অনেককিছু। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতে যে ১ কোটি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল তাদের বেশিরভাগই ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। দেশ স্বাধীন হবার পর যার একটা বড় অংশই আর স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেনি। একই সংগে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বা যুদ্ধের আগে-পরে যে পরিমাণ হিন্দু দেশ ত্যাগ করেছিল তার থেকে অনেক বেশি হিন্দু দেশ ত্যাগ করেছে যুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে। কিন্তু কেন? দীঘপাইতের সেই সন্ধ্যায় কীর্তন আসরে বসে সেকথাই দয়াময়ী ভেবেছিল স্তব্ধ হয়ে । হিন্দুদের সংগে সেদিন অনেক মুসলমানও সেখানে কীর্তন শুনতে এসেছিল। খিচুরী, লাবরা, পায়েস রান্না করেছিল উভয় ধর্মের মানুষ। দয়া এই দৃশ্য দেখে আশ্চর্য্য হয়ে চোখ বুজে রেখেছেন অনেকক্ষন।


অদ্ভুত মায়ার এক লেখা, যারা পড়বেন মায়ায় ভাসবেন। যেমনটা ভেসেছি আমি।






মৌসুমী কাদের- ১১/১২/২০১৪
টরন্টো, কানাডা।

তোকেই... (কবি - সুনন্দা শিকদার)

তোর বিছানায় যাই না আমি শুতে
আমি তো তোর ভাত-কাপড়েও নেই -
তবুও কেন আসিস আমার কাছে
প্রবল জ্বরে পুড়ছি আমি যেই !



কপাল জুড়ে তোরই ভীষণ জ্বালা
ঠোঁটের ভিতর ঠোঁট দিয়ে কি ছুঁলি?
শুকনো জিভে জিভ বুলিয়ে দিয়ে
শুষ্কতা সব কখন শুষে নিলি?



মাথার কাছে আয়নাতে তোর ছায়া
শুশ্রূষাহাত রাখে জ্বরের ঘোরে -
তিক্ত জীবন গেলাস ভরে এনে
মুখের কাছে যত্ন করে ধরে।



তুই তো আমার কেউ ছিলি না জানি
হঠাৎ কবে শত্রু এমন হলি?
সারা জীবন পণ দিয়েছি তোকে
আজকে তবু পোড়াতে তুই এলি?



একটু পরেই জ্বরের মতন তুইও
আমায় ছেড়ে যাবিই জানি চলে -
তুই কে আমার কিংবা কে তোর আমি
যাবার আগে এবার যাবি বলে ???





(source - https://www.facebook.com/sunanda.sikdar.359/posts/1583259098627190)

Sunday, March 1, 2015

ভোররাত্তিরের দেবী (কবি - দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায়)

ফিরে এসে ইকি হল,ফোন বাজলেই ভাবছি তুমি ।
বউ ঠিক বুঝতে পারছে-- পাইপ কোথাও ফুটো ,
মাপমতো প্রেসার আসছে না
হোলি গেছে কয়েক দিন আগে
আর, ছোটো এই শহরে এখন মারাত্মক বসন্ত এসেছে
কী কী যেন হচ্ছে, ঠিক বোঝানো সম্ভব নয়
তার চেয়ে মোবাইল চেপে ধরছি
হার্টের ওপর
শোনো...