Monday, April 27, 2015

দূরত্ব ও নৈকট্য (লেখক - অনুসন্ধানী আবাহন)

দূরত্ব এবং নৈকট্য বড়ই হেজিমনিক ব্যাপার স্যাপার। কোনটা যে দূরত্ব আর কোনটা যে নৈকট্য বুঝে ওঠাই যেন মুশকিল হয়ে যায় অনেকসময়। একই ঘরে পাশাপাশি নি:শ্বাসের দূরত্বে থেকেও শ্রেফ মানসিক সংযোগের অভাবে নৈকট্যবোধ বলে কিছুই থাকে না, বাড়তে থাকে দূরত্ব, শরীরটাও টানে না যেন শারীরিক সম্পর্কে। আবার, দূরে বহু দূরে থেকেও শুধু মানসিক সংযোগই নিয়ে আসে ছুঁয়ে ফেলার মত নিকটে, চাইলেই যেন চোখ বুঁজে জড়িয়ে ধরা যায়। অনুভুতি এবং আবেগের মিল অনুভব করাটাই বোধহয় আসল ক্যাটালিস্ট। বা হয়তো চিন্তার ওয়েভলেন্থে একই রকম অনুরণন।

আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা, মেনে নিয়ে মানিয়ে চলার পার্সোনাল স্পেসবিহীন সম্পর্ক, হাজার চেষ্টা করেও নিজেকে বোঝাতে না পারা শুধুই দায়িত্ব এবং কর্তব্যের সম্পর্ক, কাছাকাছি রেখেও সম্পর্কের সেতুবন্ধন গড়তে পারে না। সম্পর্ক আরো জটিল হয়ে যায় যখন বছর ১০ এক ছাদের নিচে বাস করেও একজন আরেকজনকে চিনেই উঠতে পারে না, কম্প্রোমাইজ করতে গিয়ে নিজেকেই হারিয়ে ফেলা হয়। দূরত্ব, দূরত্ব, দূরত্ব, চুকে যায় তুচ্ছ কাগুজে সম্পর্কের বাঁধন।

আবার চিঠি, টেক্সট বা ভয়েস ওভারে গড়ে ওঠা অনুভবের সম্পর্ক, চুড়ান্ত মানসিক সংযোগ গড়ে ওঠা মিষ্টি সুখানুভুতি একটা সম্পর্ককে একটু একটু করে সাজিয়ে তোলে। হয়তো পরিণতিহীনতার পারিপার্শ্বিকতা থাকে, কিন্তু তবুও সময়ের হাতে সময়কে ছেড়ে দিয়ে কাছে আসা, কাছে, আরো আরো কাছে। মনের মাঝে হাত বাড়িয়ে মনকে ছোঁয়া। শেয়ার করা ভালোলাগা গানে আবেগ ছুঁয়ে দেয়া। হঠাৎ অস্ফুট কোন ফিসফিস কথায় বুকের মাঝে মোচড় দিয়ে ওঠা নৈকট্য। পাগলের মত একে অপরকে কাছে পেতে চাওয়া। এত, এত দূরে, তবু যেন সব সময় ঘিরে থেকে ছুঁয়ে দেয়ার নৈকট্য।

দূরত্ব এবং নৈকট্যের আপেক্ষিকতায় কি সকলেই হাবুডুবু খায়? কে জানে?

Sunday, April 19, 2015

তোমার (কবি - নিশান চ্যাটার্জ্জী)

তোমার চোখে প্রদীপ ছিলো

অনন্ত এক সাঁঝের তারায়
 

সলতে-জোড়া আলোক ছিলো ;
 

বাঁধভাঙা সেই ঝড়ের মতোই
 

দুকূলপ্লাবী বন্যা ছিলো



হৃদয় জুড়ে শুকনো পাতা

প্রদীপ তেলে ফুলকি লেগে

বিশ্ববরণ হোক দাবানল,

তোমার চোখে আগুন ছিলো।



তোমার ভুরুর ধনুক-ভাঁজে,

বিপদ কিছুর আদল ছিলো,

ভীষণ ভীরু চোখের পাতায়

কয়েক কুচি বাদল ছিলো



কয়েক কুচি আদর ছিলো ;

ঘোড়সওয়ারের

তীরন্দাজীর

হৃদয়ভেদী ছোবল ছিলো।



তোমার চোখে আগুন ছিলো




অনন্ত এক ঝাড়ের বাতি,

জলসাঘরে ঝলসালো চোখ

হাজার কোটি নূপুরধ্বনি

আয়না ভাঙার আওয়াজ যেমন

তেমন কিছু জানান দিলো,

দালান মেজে ফাটল ধরে

বৃষ্টি এলো বৃষ্টি এলো



সেতার-তারে মাখন গড়ায়,

আলাপ থেকে জোড় আর ঝালা,

প্রদীপ ছিলো কয়েককুচি

ধূসর কোনো আগুন জ্বালা



হৃদয় জুড়ে শুকনো পাতা,

ভ্রূপল্লবে ক্ষণিক বাদল ;

তোমার চোখে বাদল ছিলো,

কয়েক কুচি আদর ছিলো।

Friday, April 17, 2015

স্বাতীতারা (কবি - জীবনানন্দ দাশ)

স্বাতীতারা, কবে তোমায় দেখেছিলাম কলকাতাতে আমি

দশ-পনেরো বছর আগে; সময় তখন তোমার চুলে কালো

মেঘের মতন লুকিয়ে থেকে বিদ্যুৎ জ্বালাল

তোমার নিশিত নারীমুখের— জানো তো অন্তর্যামী।

তোমার মুখ; চারিদিকে অন্ধকারে জলের কোলাহল।

কোথাও কোনো বেলাভূমির নিয়ন্তা নেই— গভীর বাতাসে

তবুও সব রণক্লান্ত অবসন্ন নাবিক ফিরে আসে।

তারা যুবা, তারা মৃত; মৃত্যু অনেক পরিশ্রমের ফল।

সময় কোথাও নিবারিত হয় না, তবু, তোমার মুখের পথে

আজও তাকে থামিয়ে একা দাঁড়িয়ে আছ নারী

হয়তো ভোরে আমরা সবাই মানুষ ছিলাম, তারই

নিদর্শনের সূর্যবলয় আজকের এই অন্ধ জগতে।

চারিদিকে অলীক সাগর জ্যাসন ওডিসিয়ূস ফিনিশিয়

সার্থবাহের অধীর আলো ধর্মাশোকের নিজের তো নয়, আপতিত কাল

আমরা আজও বহন করে, সকল কঠিন সমুদ্রে প্রবাল

লুটে তোমার চোখের বিষাদ ভর্ত্সনা… প্রেম নিভিয়ে দিলাম প্রিয়।

Thursday, April 16, 2015

তোমায় আমি (কবি - জীবনানন্দ দাশ)

তোমায় আমি দেখেছিলাম বলে
তুমি আমার পদ্মপাতা হলে;
শিশিরকণার মতন শূন্যে ঘুরে
শুনেছিলাম পদ্মপত্র আছে অনেক দূরে,
খুঁজে খুঁজে পেলাম তাকে শেষে।


নদী সাগর কোথায় চলে বয়ে
পদ্মপাতায় জলের বিন্দু হয়ে
জানি না কিছু দেখি না কিছু আর
এতদিনে মিল হয়েছে তোমার আমার
পদ্মপাতার বুকের ভিতর এসে।


তোমায় ভালবেসেছি আমি, তাই
শিশির হয়ে থাকতে যে ভয় পাই,
তোমার কোলে জলের বিন্দু পেতে
চাই যে তোমার মধ্যে মিশে যেতে
শরীর যেমন মনের সঙ্গে মিশে।


জানি আমি তুমি রবে আমার হবে ক্ষয়
পদ্মপাতা একটি শুধু জলের বিন্দু নয়।
এই আছে, নেই ; এই আছে, নেই জীবন চঞ্চল;
তা তাকাতেই ফুরিয়ে যায় রে পদ্মপাতার জল
বুঝেছি আমি তোমায় ভালবেসে।

অদ্ভুত আঁধার এক (কবি - জীবনানন্দ দাশ)

অদ্ভুত আঁধার এক আসিয়াছে পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি,
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়
মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।

Wednesday, April 15, 2015

ব্যর্থ প্রেম (কবি - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)

প্রতিটি ব্যর্থ প্রেমই আমাকে নতুন অহঙ্কার দেয়
আমি মানুষ হিসেবে একটু লম্বা হয়ে উঠি
দুঃখ আমার মাথার চুল থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত
ছড়িয়ে যায়
আমি সমস্ত মানুষের থেকে আলাদা হয়ে এক
অচেনা রাস্তা দিয়ে ধীরে পায়ে
হেঁটে যাই


সার্থক মানুষদের আরো-চাই মুখ আমার সহ্য হয় না
আমি পথের কুকুরকে বিস্কুট কিনে দিই
রিক্সাওয়ালাকে দিই সিগারেট
অন্ধ মানুষের সাদা লাঠি আমার পায়ের কাছে
খসে পড়ে
আমার দু‘হাত ভর্তি অঢেল দয়া, আমাকে কেউ
ফিরিয়ে দিয়েছে বলে গোটা দুনিয়াটাকে
মনে হয় খুব আপন


আমি বাড়ি থেকে বেরুই নতুন কাচা
প্যান্ট শার্ট পরে
আমার সদ্য দাড়ি কামানো নরম মুখখানিকে
আমি নিজেই আদর করি
খুব গোপনে


আমি একজন পরিচ্ছন্ন মানুষ
আমার সর্বাঙ্গে কোথাও
একটুও ময়লা নেই
অহঙ্কারের প্রতিভা জ্যোতির্বলয়
হয়ে থাকে আমার
মাথার পেছনে


আর কেউ দেখুক বা না দেখুক
আমি ঠিক টের পাই
অভিমান আমার ওষ্ঠে এনে দেয় স্মিত হাস্য
আমি এমনভাবে পা ফেলি যেন মাটির বুকেও
আঘাত না লাগে
আমার তো কারুকে দুঃখ দেবার কথা নয়।

Wednesday, April 8, 2015

(কবি - নিশান চ্যাটার্জ্জী)

হয়তো ধরো তেমন কোনো সম্বন্ধ নেই


কেবল ছিলো রিকশা তাতে ত্রিপল ছিলো


বৃষ্টি ছিলো,


ঝাপসা ছিলো,


চতুর্দিকে।


আর দুখানা মানুষ ছিলো,


ভীষণ ভিজে মানুষ ছিলো,


একবুকে তার একটি মাথা,


আর এক হাতে কাঁধটি ছিলো,


দুঃখ ছিলো, গল্পছিলো,


ভীষণ কিছু খুব সাধারণ


ভীষণ চেনা গল্প ছিলো।


কষ্ট গড়ায় দুঃখজলে, 


চোখ সয়ে যায় নুনের ধারায়


তক্ষুণি ঠিক!


তক্ষুণি ঠিক চমক দিলো,


দু মুখ জ্বলে ক্ষণিক সুখে,


দুহাত তালু গালের পাশে 


হাতের ফাঁকে পানপাতা মুখ,


দুঃখ গড়ায় বৃষ্টিজলে,


সুখ ছুঁয়ে যায় গোপন হৃদয়,


মানুষ দুটি মোমের মতই


গলছে সুখে গলছে হাওয়ায়...

Sunday, April 5, 2015

কথা (কবি - সম্বুদ্ধ ভট্টাচার্য)

শব্দ ভেবে ধরতে গিয়ে দেখি-
হাওয়ার উপর যায় ভেসে যায় কথা,
কোথায় এমন ত্রস্ত কথা রাখি?
কথা দিয়েও হচ্ছে যা অন্যথা.



হয়ত তোমায় দিয়েছিলাম কথা,
হয়ত কোনো কথা দেওয়ার ছলে-
হয়ত আরো বছর ঘুরে গেছে,
খুঁজছি আজও মুকুর ধরা জলে.



সেসব কথা আমার কাছে ছোট-
সেসব কথায় তোমার জীবন রাখা-
এসব কথা আজকে কানে লাগে,
এসব কথা প্রতিশ্রুতিমাখা।



আমার মতই তোমার কথা ও থাকুক-

সেসব দুপুর, সেসব গাছের পাশে-


চূর্ণী  সেসব কথার হিসেব রাখুক-


শব্দ গুনে খেলার অবকাশে।

Thursday, April 2, 2015

যে টেলিফোন আসার কথা (কবি - পূর্ণেন্দু পত্রী)



যে টেলিফোন আসার কথা সে টেলিফোন আসেনি।

প্রতীক্ষাতে প্রতীক্ষাতে

সূর্য ডোবে রক্তপাতে

সব নিভিয়ে একলা আকাশ নিজের শূন্য বিছানাতে।

একান্তে যার হাসির কথা হাসেনি

যে টেলিফোন আসার কথা আসেনি।





অপেক্ষমান বুকের ভিতর কাঁসর-ঘন্টা শাঁখের উলু

একশো বনের বাতাস এসে একটা গাছে হুলুস্থুলু

আজ বুঝি তার ইচ্ছে আছে

ডাকবে আলিঙ্গনের কাছে

দীঘির পাড়ে হারিয়ে যেতে সাঁতার-জলের মত্ত নাচে।

এখনও কি ডাকার সাজে সাজেনি ?

যে টেলিফোন বাজার কথা বাজেনি।





তৃষ্ণা যেন জলের ফোঁটা বাড়তে বাড়তে বৃষ্টি বাদল

তৃষ্ণা যেন ধূপের কাঠি গন্ধে আঁকে সুখের আদল

খাঁ খাঁ মনের সবটা খালি

মরা নদীর চড়ার বালি

অথচ ঘর দুয়ার জুড়ে তৃষ্ণা বাজায় করতালি

প্রতীক্ষা তাই প্রহরবিহীন

আজীবন ও সর্বজনীন

সরোবর তো সবার বুকেই, পদ্ম কেবল পর্দানশীন

স্বপ্নকে দেয় সর্বশরীর, সমক্ষে সে ভাসে না।

যে টেলিফোন আসার কথা সচরাচর আসে না ।।